ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৫তম ভাইস চ্যান্সেলর হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের প্রফেসর ড. এ.কে.এম. মতিনুর রহমান। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ থেকে জারিকৃত এক প্রজ্ঞাপনে এ তথ্য জানানো হয়। রাষ্ট্রপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্যের অনুমোদনক্রমে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ১৯৮০ অনুযায়ী তাঁকে এ পদে নিয়োগ প্রদান করা হয়েছে। প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়, যোগদানের তারিখ থেকে তিনি চার বছর মেয়াদে অথবা বয়সসীমা পূর্ণ হওয়া পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করবেন। উপাচার্য হিসেবে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করবেন।
অভিনন্দন জ্ঞাপন/
_----------------------------
নবনিযুক্ত ভাইস চ্যান্সেলরকে অভিনন্দন জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের মাননীয় প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর প্রফেসর ড. এম এয়াকুব আলী। তিনি বলেন, ড. মতিনুর রহমান দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষা, গবেষণা ও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে আসছেন। তাঁর নিয়োগে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণার মান আরও সমৃদ্ধ হবে।
প্রফেসর মতিনুর রহমান/
---------------------------------------
প্রফেসর ড. এ.কে.এম মতিনুর রহমান বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা, রাষ্ট্রচিন্তা, গনতন্ত্র, উন্নয়ন, উন্নয়ন প্রশাসন ও জননীতি গবেষণার অঙ্গনে সুপরিচিত এক শিক্ষাবিদ, গবেষক ও প্রশাসক। দীর্ঘ একাডেমিক জীবনে তিনি শিক্ষকতা, গবেষণা, প্রশাসনিক নেতৃত্ব এবং বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার মাধ্যমে দেশের বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছেন। শিক্ষাক্ষেত্রে তার পথচলা যেমন মেধা ও অধ্যবসায়ের সাক্ষ্য বহন করে, তেমনি প্রশাসনিক দক্ষতা ও গবেষণামূলক কাজ তাকে সমসাময়িক উচ্চশিক্ষা পরিমণ্ডলে একটি স্বতন্ত্র অবস্থানে নিয়ে গেছে।
বগুড়া জেলার কাহালু উপজেলার চোপিনগরে জন্ম নেওয়া অধ্যাপক মতিনুর রহমান শৈশব থেকেই মেধাবী শিক্ষার্থী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তিনি ১৯৮৫ সালে চোপিনগর এম এল উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং ১৯৮৭ সালে কাহালু কলেজ থেকে এইচএসসি সম্পন্ন করেন। উচ্চমাধ্যমিক পর্যায় শেষে তিনি দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন। সেখানে তিনি ১৯৯০ সালে বিএসএস (সম্মান) এবং ১৯৯১ সালে এমএসএস ডিগ্রি অর্জন করেন। স্নাতকোত্তর পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে তৃতীয় স্থান অর্জন তার একাডেমিক উৎকর্ষের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি।
শুধু দেশীয় উচ্চশিক্ষাতেই সীমাবদ্ধ না থেকে তিনি আন্তর্জাতিক পরিসরেও জ্ঞানচর্চার পরিধি বিস্তৃত করেন। পরবর্তীতে অস্ট্রেলিয়ার University of New South Wales থেকে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে এমএ ডিগ্রি অর্জন করেন। বৈশ্বিক রাজনীতি, উন্নয়ন তত্ত্ব এবং প্রশাসনিক কাঠামো বিষয়ে তার আগ্রহ এই উচ্চশিক্ষা অর্জনের মধ্য দিয়ে আরও গভীরতা লাভ করে। গবেষণার ধারাবাহিকতায় তিনি বাংলাদেশের দারিদ্র্য বিমোচন ও উন্নয়ন কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে দীর্ঘ সময় কাজ করেন। ২০০৭ সালে “Poverty Alleviation and Development: A Study of NGO Operations in Bangladesh” শীর্ষক গবেষণার মাধ্যমে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। তার এই গবেষণায় বাংলাদেশের এনজিও কার্যক্রম, উন্নয়ন কৌশল, সামাজিক বৈষম্য এবং দারিদ্র্য নিরসনে প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগের বাস্তব চিত্র বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
অধ্যাপক মতিনুর রহমান ১৯৯৬ সালে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাষক হিসেবে শিক্ষকতা জীবন শুরু করেন। একই বছর তিনি কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের পলিটিকস অ্যান্ড পাবলিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বিভাগে যোগদান করেন। শিক্ষকতা জীবনের শুরু থেকেই তিনি শিক্ষার্থীদের কাছে একজন মননশীল ও গবেষণামুখী শিক্ষক হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। পরবর্তীকালে তিনি সহকারী অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক এবং ২০০৮ সালে অধ্যাপক পদে উন্নীত হন। বর্তমানে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক দায়িত্ব দক্ষতার সঙ্গে পালন করেছেন। সহকারী প্রক্টর, প্রক্টর, হল প্রভোস্ট, বিভাগীয় সভাপতি এবং সেন্টার ফর সোশ্যাল স্টাডিজের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে তিনি প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার একটি সমৃদ্ধ ভাণ্ডার গড়ে তুলেছেন। এছাড়া তিনি সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতি নির্ধারণ, একাডেমিক পরিবেশ উন্নয়ন এবং শিক্ষকদের পেশাগত অধিকার রক্ষায়ও তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। তিনি সাদা দলের প্রতিষ্ঠাতা আহ্বায়ক, ইউট্যাবের কার্যনির্বাহী সদস্য এবং শিক্ষক সমিতির সাবেক সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
গবেষণা ও জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রেও অধ্যাপক মতিনুর রহমানের অবদান উল্লেখযোগ্য। দারিদ্র্য বিমোচন, সুশাসন, উন্নয়ন প্রশাসন, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, নগর ব্যবস্থাপনা, জলবায়ু পরিবর্তন, নারীর ক্ষমতায়ন এবং মানবনিরাপত্তা ইস্যুতে তার ৩০টিরও বেশি গবেষণা প্রবন্ধ দেশি-বিদেশি স্বনামধন্য জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। তার গবেষণায় তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের পাশাপাশি বাংলাদেশের বাস্তব সামাজিক ও প্রশাসনিক প্রেক্ষাপট গুরুত্ব পেয়েছে। গবেষক হিসেবে তিনি উন্নয়ন ও প্রশাসনিক কাঠামোর সীমাবদ্ধতা এবং সম্ভাবনা নিয়ে সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন।
তার রচিত উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে NGO and Development: Myth & Reality এবং Poverty and Development in Bangladesh। এসব গ্রন্থে বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রক্রিয়া, এনজিওর কার্যকারিতা এবং সামাজিক পরিবর্তনের নানা দিক বিশ্লেষণ করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তিনি সক্রিয়ভাবে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। নেপাল, শ্রীলঙ্কা, চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, ইন্দোনেশিয়া, সুইডেন ও মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে আয়োজিত আন্তর্জাতিক সম্মেলনে তিনি গবেষণা প্রবন্ধ উপস্থাপন করেছেন।
একাডেমিক ও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি জাতীয় বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলে সমসাময়িক রাজনৈতিক, সামাজিক ও প্রশাসনিক বিষয় নিয়ে নিয়মিত মতামত দিয়ে তিনি একজন জনবুদ্ধিজীবী হিসেবেও পরিচিতি লাভ করেছেন। শিক্ষা, গবেষণা ও প্রশাসনের সমন্বয়ে অধ্যাপক মতিনুর রহমান দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় একটি অভিজ্ঞ, প্রাজ্ঞ ও গ্রহণযোগ্য নাম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন।
-----
তথ্য প্রকাশনা ও জনসংযোগ অফিস
Edited By: Dr. Amanur Aman