বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচিতি এবং উৎকর্ষ

 ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশকুষ্টিয়া

   (জ্ঞানঐতিহ্য ও নৈতিকতার এক অনন্য মিলনস্থল)

কুষ্টিয়া-ঝিনাইদহ মহাসড়ক সংলগ্ন শান্তিডাঙ্গা-দুলালপুর নামক স্থানে সবুজ প্রান্তরে যে বিশাল ক্যাম্পাসটি চোখে পড়ে, তা হলো বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর প্রতিষ্ঠিত প্রথম পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ‘ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ’। এর পেছনে লুকিয়ে আছে এই ভূখণ্ডের মুসলমান ও মুসলিম বুদ্ধিজীবীদের প্রায় এক শতাব্দীর স্বপ্ন, সংগ্রাম আর অপেক্ষার গল্প। অবশেষে, আসে আকাঙ্ক্ষার বাস্তব সেই ঐতিহাসিক দিন ১৯৭৯ সালের ২২ নভেম্বর, যখন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ইসলামী শিক্ষা ও আধুনিক জ্ঞানের সমন্বয়ে জাতির জন্য দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার ব্রত নিয়ে নিজ হাতে কুষ্টিয়া-ঝিনাইদহ জেলার মধ্যবর্তী শান্তিডাঙ্গা-দুলালপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন[1]। এর পরের বছর, ১৯৮০ সালে প্রণীত হয় Islamic University Act, যা এই প্রতিষ্ঠানকে দেয় তার আইনি অস্তিত্ব ও ভিত্তি[2]

 একটি স্বপ্নের দীর্ঘ যাত্রা

এ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার গল্পের শুরু ব্রিটিশ আমলে। ১৯২০ সালে মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী চট্টগ্রামের পটিয়ায় প্রথম মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেছিলেন। এরপর একে একে ১৯৩৫ সালে মাওলানা শওকত আলির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন[3], ২৭ জুলাই ১৯৩৮ সালে মাওলা বক্স কমিটি গঠন এবং ১৯৪১ সালে মাওলা বক্স কমিটির University of Islamic Learning-প্রতিষ্ঠার সুপারিশ[4], ১৯৪৬-৪৭ সালে সৈয়দ মোয়াজ্জেম উদ্দীন কমিটির প্রস্তাব, ১৯৪৯-৫১ সালে মাওলানা মুহাম্মদ আকরাম খাঁ কমিটির পুনরাবৃত্ত আহ্বান[5], ১৯৬৩-১৯৬৪ সালে ড. এস. এম. হোসাইনের নেতৃত্বে ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয় কমিশন গঠন (আনওয়ারী, ১৯৯৩, পৃ: ৩৯)[6], এবং ১৯৬৪ সালে তৎকালীন গভর্নর মোনায়েম খানের ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ঘোষণা[7] — প্রতিটি পদক্ষেপই ছিল একই লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যাওয়ার প্রয়াস। স্বপ্নটি বারবার হোঁচট খেয়েছে, কিন্তু নিভে যায়নি।

 স্বাধীন বাংলাদেশে স্বপ্নের বাস্তবায়ন

স্বাধীনতার পর অবশেষে ১৯৭৬ সালের ১ ডিসেম্বর বাংলাদেশ সরকার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেয় (ওয়ালীউল্লাহ, ১৯৯৩, পৃ: ৪৬)[8] । এর পরের বছর, ১৯৭৭ সালের ২৭ জানুয়ারি, প্রফেসর এম. এ. বারীর নেতৃত্বে সাত সদস্যবিশিষ্ট একটি পরিকল্পনা কমিটি গঠিত হয়, তাঁরা সেই বছরেরই ২০ অক্টোবর তাদের প্রতিবেদন জমা দেন[9]। এছাড়াও ১৯৭৭ সালের ৩১ মার্চ – ৮ এপ্রিল সৌদি আরবে অনুষ্ঠিত The Organization of Islamic Cooperation (OIC)-এর সম্মেলনে মুসলিম দেশসমূহে ইসলামিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব উত্থাপিত হয়[10]। ফলস্বরূপ, ১৯৭৯ সালের ২২ নভেম্বর কুষ্টিয়া-ঝিনাইদহ জেলার শান্তিডাঙ্গা-দুলালপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন হয়1। জাতীয় সংসদে ১৯৮০ সালে Islamic University Act 1980 পাস হয়, যা বিশ্ববিদ্যালয়টিকে দেয় তার আইনি ভিত্তি2। তবে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন থেকে প্রকৃত শিক্ষাদান শুরু হতে সময় লেগেছিল আরও কিছু বছর।

প্রশাসনিক ও একাডেমিক যাত্রা (১৯৮১–১৯৯২)

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার ১৯৮১ সালের ১ জানুয়ারি, প্রফেসর এ. এন. এম. মোমতাজ উদ্দিন চৌধুরীকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেয় এবং প্রশাসনিক কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়। ১৯৮২ সালের ১৬ অক্টোবর অস্থায়ী ক্যাম্পাস স্থানান্তর: রাষ্ট্রপতির আদেশে বিশ্ববিদ্যালয়কে শান্তিডাঙ্গা–দুলালপুর (কুষ্টিয়া–ঝিনাইদহ) থেকে গাজীপুরের বোর্ডবাজারে ৫০ একর জায়গায় স্থানান্তর করা হয়। একই সঙ্গে চলমান অবকাঠামো নির্মাণ কার্যক্রম স্থগিত করা হয়। ১৮ জুলাই ১৯৮৩ – সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়কে গাজীপুরে স্থানান্তরের নির্দেশ জারি করে[11]। ১৯৮৩ সালের ২১ জুলাই, রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ দ্বিতীয়বারের মতো গাজীপুর বোর্ডবাজার ক্যাম্পাস উদ্বোধন করেন[12]

১৯৮৫ - ১৯৮৬ শিক্ষাবর্ষে, বিশ্ববিদ্যালয় প্রথমবারের মতো স্নাতক পর্যায়ে শিক্ষার্থী ভর্তি কার্যক্রম শুরু করে। ১৯৮৬ সালের ২৮ জুন বিশ্ববিদ্যালয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে একাডেমিক কার্যক্রম শুরু হয় — আর সেই থেকে এক নতুন অধ্যায়ের সুচনা। মাত্র ৩০০ জন শিক্ষার্থী ও ৮ জন শিক্ষক নিয়ে, ২টি অনুষদের অধীনে ৪টি বিভাগে শিক্ষাদান কার্যক্রম শুরু হয়েছিল।

অবশেষে২৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৯০ বিশ্ববিদ্যালয়কে পুনরায় কুষ্টিয়ায় স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়[13]। ১৯৯২ সালের ১ নভেম্বর ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় স্থায়ী ক্যাম্পাসে, কুষ্টিয়া-ঝিনাইদহ জেলার মধ্যবর্তী শান্তিডাঙ্গা-দুলালপুরে, আনুষ্ঠানিকভাবে ফিরে আসে এবং এখানেই স্থায়ীভাবে একাডেমিক কার্যক্রম শুরু হয়।

 আজকের ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

আজ প্রতিষ্ঠার চার দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় দাঁড়িয়ে আছে জ্ঞানচর্চার এক বিশাল মিনার হয়ে। ১৭৫ একরের বিস্তৃত সবুজ ক্যাম্পাসে ৯টি অনুষদ, ৩৬টি বিভাগ, ১টি ইনস্টিটিউট, এবং  প্রায় ২০,০০০ শিক্ষার্থী নিয়ে সমৃদ্ধ এই বিশ্ববিদ্যালয়টি। বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে অনার্স, মাস্টার্স, এমফিল, পিএইচডি, স্বল্পমেয়াদি প্রফেশনাল ডিপ্লোমা এবং সার্টিফিকেট কোর্সসমূহ (বাংলা, ইংরেজি, আরবি, চীনা এবং জাপানি ভাষার কোর্স) পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নের জন্য সব ধরনের প্রোগ্রাম চালু আছে। বর্তমানে আরো কয়েকটি বিভাগ চালুর জন্য প্রক্রিয়াধীন। বিশ্ববিদ্যালয়ের সমস্ত মানোন্নয়ন কার্যক্রম “Institutional Quality Assurance Cell”(IQAC)দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে।

শিক্ষার্থীদের জন্য একাডেমিক উৎকর্ষের পাশাপাশি স্বাস্থ্য, জ্ঞান, আবাসন ও বিনোদনের পূর্ণাঙ্গ সুযোগ-সুবিধা চালু রয়েছে। স্বাস্থ্যসেবার জন্য আধুনিক মেডিকেল সেন্টার, জ্ঞানচর্চাকে সমৃদ্ধ করতে সেন্ট্রাল সায়েন্টিফিক ল্যাব, আবাসনের জন্য প্রশস্ত আবাসিক হল, শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার জন্য আধুনিক জিমনেশিয়ামএবং পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মানের বাদশাহ ফাহদ বিন আবদুল আজিজ সেন্ট্রাল লাইব্রেরি শিক্ষার্থীদের জন্য উন্মুক্ত রয়েছে।

শুরুর দিকে ওআইসি-র(OIC) সহায়তায় পরিচালিত হলেও, বর্তমানে এটি সম্পূর্ণরূপে বাংলাদেশ সরকারের অর্থায়নে পরিচালিত একটি পূর্ণাঙ্গ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়।

 এক ঐতিহ্যের প্রতিচ্ছবি

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস আসলে একটি জাতির আত্মপরিচয় খুঁজে পাওয়ার ইতিহাস। ব্রিটিশ আমলের স্বপ্নদ্রষ্টাদের চিন্তা থেকে শুরু করে স্বাধীন বাংলাদেশের বাস্তবতায় তার পূর্ণাঙ্গ রূপ লাভ—এই দীর্ঘ পথচলা প্রমাণ করে, ইসলামী শিক্ষা ও আধুনিক জ্ঞানের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এই প্রতিষ্ঠানটি নিছক কোনো কাকতালীয় সৃষ্টি নয়, বরং বহু মানুষের নিরলস প্রচেষ্টা ও দূরদর্শী পরিকল্পনার ফসল। প্রতিষ্ঠাকালীন থেকে বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষা কার্যক্রম কখনও কখনও হোঁচট খেলেও, তার অভিষ্ঠ লক্ষ্যে যাবার প্রানান্ত চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে।

বর্তমান উপাচার্য প্রফেসর ড. এ. কে. এম. মতিনুর রহমান, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (Artificial Intelligence)এই যুগসন্ধিক্ষণের প্রান্তে দাঁড়িয়ে, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা স্থপতি ও বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের রেখে যাওয়া ঐতিহ্য ও দূরদৃষ্টিকে এগিয়ে নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়কে বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও শিক্ষাক্ষেত্রে প্রকৃত অর্থে একটি Center of Excellence- এ রূপান্তরিত করার লক্ষ্যে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।

 References

[1] Bangladesh Observer, November 23, 1979.

[2]২৭ শে ডিসেম্বর, ১৯৮০। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ১৯৮০। Retrieved from: http://bdlaws.minlaw.gov.bd/act-609.html

[3] রহমান, মুজিবুর (১৯৭৭)| মাওলানা ইসলামাবাদী, মাসিক আত-তাওহীদ: জুন-১৯৭৭ইং। পৃষ্ঠা: ৮৭

[4] The Report of the Madrasha Education (Moula Baksh) Committee 1938 and Dr. Sekander Ali Ibrahim Reports on Islamic Education and Madrasah Education in Bengal, V-III, P. 908.

[5] Ali, Ayub (1983). History of Traditional Islamic Education in Bangladesh. Islamic Foundation Bangladesh, Dhaka: P. 167

[6] আনওয়ারী, আব্দুর রহমান (২৭ এপ্রিল ১৯৯৩)| ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়: অতীত ও বর্তমান| প্রথম সমাবর্তন-১৯৯৩| ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া, বাংলাদেশ| পৃষ্ঠা ৩৫-৪৪

[7] দৈনিক আজাদ, ১২ ই অক্টোবর ১৯৬৪

[8] ওয়ালীউল্লাহ, আবুল খায়ের মুহাম্মদ(২৭ এপ্রিল ১৯৯৩)| ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়: অতীত ও বর্তমান| প্রথম সমাবর্তন-১৯৯৩| ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া, বাংলাদেশ| পৃষ্ঠা ৪৫-৪৯

[9]ওয়ালীউল্লাহ, আবুল খায়ের মুহাম্মদ(২৭ এপ্রিল ১৯৯৩)| ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়: অতীত ও বর্তমান| প্রথম সমাবর্তন-১৯৯৩| ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া, বাংলাদেশ| পৃষ্ঠা ৪৬

[10] আমিন, রুহুল, মোঃ (২৭ এপ্রিল ১৯৯৩)| ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের অতীত ও বর্তমান| প্রথম সমাবর্তন-১৯৯৩| ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া, বাংলাদেশ| পৃষ্ঠা ৫১

[11]ওয়ালীউল্লাহ, আবুল খায়ের মুহাম্মদ(২৭ এপ্রিল ১৯৯৩)| ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়: অতীত ও বর্তমান| প্রথম সমাবর্তন-১৯৯৩| ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া, বাংলাদেশ| পৃষ্ঠা ৪৭

[12]আনওয়ারী, আব্দুর রহমান (২৭ এপ্রিল ১৯৯৩)| ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়: অতীত ও বর্তমান| প্রথম সমাবর্তন-১৯৯৩|ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া, বাংলাদেশ| পৃষ্ঠা ৪১

[13]ওয়ালীউল্লাহ, আবুল খায়ের মুহাম্মদ(২৭ এপ্রিল ১৯৯৩)| ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়: অতীত ও বর্তমান| প্রথম সমাবর্তন-১৯৯৩| ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া, বাংলাদেশ| পৃষ্ঠা ৪৭